জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড (1919): ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের এক যুগান্তকারী অধ্যায়

13 April 1919, ভারতীয় ইতিহাসের পাতায় একটি রক্তিম দিন হিসেবে চিহ্নিত। পাঞ্জাবের অমৃতসরে সংঘটিত জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতে ঔপনিবেশিক নিষ্ঠুরতার এক চরম নিদর্শন। এই ঘটনাটি ব্রিটিশ শাসনের “ন্যায়বিচার” এবং “সভ্যতা”-র মুখোশ সম্পূর্ণভাবে খুলে দিয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই ঘটনার প্রতিবাদে তাঁর ‘Knighthood’ উপাধি ত্যাগ করেছিলেন এবং মহাত্মা গান্ধী ব্রিটিশদের প্রতি তাঁর বিশ্বাস হারিয়ে অসহযোগ আন্দোলনের (Non-Cooperation Movement) ডাক দিয়েছিলেন। ঐতিহাসিকদের মতে, এই হত্যাকাণ্ডই ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের গতিপথ সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছিল এবং মডারেট রাজনীতি থেকে গণ-আন্দোলনের দিকে ভারতকে চালিত করেছিল।

এক নজরে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য (Key Facts for Prelims)

বিষয়তথ্য
তারিখ13 April 1919
উৎসববৈশাখী (Baisakhi)
স্থানজালিয়ানওয়ালাবাগ, অমৃতসর, পাঞ্জাব
মূল ভিলেনব্রিগেডিয়ার জেনারেল রেজিনাল্ড ডায়ার (Reginald Dyer)
পাঞ্জাবের গভর্নরমাইকেল ও’ডায়ার (Michael O’Dwyer)
ভারতের ভাইসরয়লর্ড চেমসফোর্ড (Lord Chelmsford)
তদন্ত কমিশনহান্টার কমিশন (Hunter Commission)
কে উপাধি ত্যাগ করেন?রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (Knighthood)
প্রতিশোধ গ্রহণকারীসর্দার উধাম সিং (1940 সালে ও’ডায়ারকে হত্যা)
সরকারি মৃতের সংখ্যা379
কংগ্রেসের মতে মৃতের সংখ্যা1000+

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং পাঞ্জাবের অস্থিরতা (Socio-Political Backdrop)

জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না; এটি ছিল পাঞ্জাবে দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ।

পাঞ্জাবের বিশেষ পরিস্থিতি

ব্রিটিশদের কাছে পাঞ্জাব ছিল “Sword Arm of India”। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে (1914-1918) ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রায় 60% সৈন্যই ছিল পাঞ্জাবি। যুদ্ধের সময় জোরপূর্বক সৈন্য সংগ্রহ (Forced Recruitment) এবং যুদ্ধের জন্য চাঁদা আদায় পাঞ্জাবের গ্রামীণ অর্থনীতিকে ভেঙে দিয়েছিল।

  • মাইকেল ও’ডায়ারের শাসন: পাঞ্জাবের লেফটেন্যান্ট গভর্নর Sir Michael O’Dwyer বিশ্বাস করতেন যে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি এবং “শহুরে উকিলরা” ব্রিটিশ শাসনের শত্রু। তিনি সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণ করেছিলেন এবং Defense of India Act, 1915 ব্যবহার করে বহু জাতীয়তাবাদী নেতাকে পাঞ্জাবে প্রবেশে নিষিদ্ধ করেছিলেন।
  • গদর আন্দোলনের ভীতি: 1914-15 সালে গদর পার্টির বিপ্লবীরা (Ghadarites) পাঞ্জাবে একটি সশস্ত্র অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা করেছিল। যদিও তা ব্যর্থ হয়, কিন্তু ব্রিটিশ প্রশাসন সর্বদাই “আরেকটি 1857 সালের মহাবিদ্রোহ”-এর ভয়ে ভীত ছিল। এই ভয় থেকেই ও’ডায়ার এবং ডায়ারের মতো প্রশাসকরা মনে করতেন যে কোনো ছোটখাটো বিক্ষোভও বড় বিদ্রোহের সূচনা হতে পারে।

অর্থনৈতিক সংকট

যুদ্ধের পরে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পায় প্রায় 100%। গমের দাম আকাশচুম্বী হয়, যা পাঞ্জাবের সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ করে তোলে। এর সাথে যুক্ত হয় 1918 সালের ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারী (Spanish Flu), যাতে লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা যায়। এই পরিস্থিতিতে ব্রিটিশ সরকারের ওপর মানুষের ক্ষোভ ছিল চরমে।


রাওলাট আইন – সংঘাতের সূত্রপাত (The Spark)

ব্রিটিশ সরকার ভেবেছিল যুদ্ধের পর বিপ্লবীদের দমন করতে সাধারণ আইন যথেষ্ট নয়। তাই তারা Sedition Committee গঠন করে।

আইনের ধারা ও প্রভাব

বিচারপতি Sir Sidney Rowlatt-এর সুপারিশে Anarchical and Revolutionary Crimes Act of 1919 পাস হয়। এই আইনের বিশেষ দিকগুলো ছিল:

  1. Habeas Corpus স্থগিত: সরকার যাকে খুশি তাকে কোনো কারণ দর্শানো ছাড়াই গ্রেপ্তার করতে পারে।
  2. ক্যামেরা ট্রায়াল: বিশেষ আদালতে বিচার হবে যেখানে কোনো জুরি থাকবে না এবং বিচার হবে রুদ্ধদ্বার কক্ষে (In camera)।
  3. সাক্ষ্য প্রমাণ: এমন সাক্ষ্য গ্রহণ করা যাবে যা সাধারণ আইনে গ্রাহ্য নয় (যেমন মৃত ব্যক্তির পূর্বের জবানবন্দি)।
  4. নিষেধাজ্ঞা: দণ্ডিত ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট এলাকায় বসবাসের নির্দেশ দেওয়া বা জামানত চাওয়া।

গান্ধীজি এই আইনকে “Black Bill” আখ্যা দেন এবং বলেন, এটি মানুষের মৌলিক স্বাধীনতার ওপর আঘাত। জিন্নাহ (Jinnah) ইম্পেরিয়াল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলে প্রতিবাদ জানিয়ে পদত্যাগ করেন এবং বলেন, “A government that passes or sanctions such a law in times of peace forfeits its claim to be called a civilized government.”


অমৃতসরের ঘটনাপ্রবাহ (Detailed Chronology)

April 1919-এর প্রতিটি দিন ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল।

6 এপ্রিল থেকে 9 এপ্রিল

  • 6 April: গান্ধীজির ডাকে সারা ভারতে হরতাল পালিত হয়। অমৃতসরে এটি শান্তিপূর্ণ ছিল।
  • 9 April (Ram Navami): হিন্দু-মুসলিম ঐক্য ব্রিটিশ প্রশাসনকে আতঙ্কিত করে তোলে। মিছিলে হিন্দুরা মুসলিমদের শরবত খাওয়াচ্ছে এবং মুসলিমরা হিন্দুদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে হাঁটছে— এই দৃশ্য ও’ডায়ারকে বিচলিত করে। তিনি একে ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে “ষড়যন্ত্র” হিসেবে দেখেন।

10 এপ্রিল: হিংসার বিস্ফোরণ

সকাল 10 টায় ডেপুটি কমিশনার Miles Irving ডঃ সত্যপাল এবং ডঃ কিচলুকে তার বাংলোতে ডেকে পাঠান এবং সেখান থেকেই তাদের গোপনে ধর্মশালায় (Himachal Pradesh) নির্বাসিত করা হয়।

  • খবরটি ছড়িয়ে পড়লে প্রায় 50,000 মানুষ সিভিল লাইন্সের দিকে এগোতে থাকে।
  • রেলওয়ে ব্রিজের কাছে মাউন্টেড পুলিশ (Mounted Police) গুলি চালায়, এতে 20-25 জন ভারতীয় নিহত হয়।
  • এর প্রতিক্রিয়ায় জনতা হিংসাত্মক হয়ে ওঠে। ন্যাশনাল ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া, চার্টার্ড ব্যাংক এবং টাউন হল পুড়িয়ে দেওয়া হয়। 5 জন ইউরোপীয়কে হত্যা করা হয়।
  • Marcella Sherwood Incident: মিস শেরউড নামক এক মিশনারি স্কুল শিক্ষিকাকে সাইকেল চালানোর সময় জনতা আক্রমণ করে এবং মারধর করে রাস্তায় ফেলে রাখে। পরে কিছু স্থানীয় ভারতীয় তাকে উদ্ধার করে। এই ঘটনাটি জেনারেল ডায়ারকে বিশেষভাবে ক্ষিপ্ত করেছিল।

11 এপ্রিল: ডায়ারের আগমন

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল Reginald Dyer জলন্ধর থেকে অমৃতসরে এসে পৌঁছান। তিনি এসেই শহরটিকে কার্যত সামরিক শাসনের অধীনে নিয়ে নেন, যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে Martial Law তখনও জারি হয়নি। তিনি শহরে মিছিল ও সভা নিষিদ্ধ করেন। তবে এই নিষেধাজ্ঞার খবর (Proclamation) শহরের সব জায়গায় ঠিকমতো পৌঁছায়নি, কারণ ডায়ার নিজে খুব কম জায়গায় গিয়েছিলেন এবং মূলত ইংরেজি ও উর্দুতে ঘোষণা করা হয়েছিল, যা অনেক সাধারণ মানুষ বুঝতে পারেনি।


13 এপ্রিল – সেই অভিশপ্ত বিকেল (The Anatomy of the Massacre)

বাগের ভৌগোলিক অবস্থান

জালিয়ানওয়ালাবাগ কোনো সাজানো বাগান ছিল না, এটি ছিল একটি এবড়োখেবড়ো ময়দান (Wasteland)। এর আয়তন ছিল প্রায় 200 yards x 200 yards। চারপাশ ছিল বাড়ি ও দেয়াল দিয়ে ঘেরা। মূল প্রবেশ পথটি ছিল খুবই সরু, মাত্র 7-8 ফুট চওড়া, যার কারণে ডায়ারের সাঁজোয়া গাড়ি ভেতরে ঢুকতে পারেনি।

গুপ্তচর হংস রাজ (Hans Raj)

ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, Hans Raj নামক এক ব্যক্তি সভার আয়োজকদের অন্যতম ছিলেন। তিনিই মানুষকে সেখানে জড়ো হওয়ার জন্য উৎসাহিত করেছিলেন। পরবর্তীতে অভিযোগ ওঠে যে তিনি ব্রিটিশ পুলিশের ‘সিক্রেট এজেন্ট’ (Approver) ছিলেন এবং তিনি ডায়ারকে সংকেত দিয়েছিলেন কখন গুলি চালাতে হবে। (এটি একটি বিতর্কিত বিষয়, তবে অনেক ঐতিহাসিক রেকর্ডে এর উল্লেখ আছে)।

বাহিনী ও অস্ত্রসজ্জা

ডায়ারের বাহিনীতে কোনো ব্রিটিশ সৈন্য (White soldiers) ছিল না। তার সাথে ছিল:

  • 25 জন গুর্খা সৈন্য (রাইফেলধারী)।
  • 25 জন বালুচি সৈন্য (রাইফেলধারী, 54th Sikhs এবং 59th Scinde Rifles থেকে)।
  • 40 জন গুর্খা (যাদের হাতে শুধু খুকরি ছিল)।
  • দুটি Armoured Cars (মেশিনগান যুক্ত), যা বাইরে রেখে দেওয়া হয়েছিল।

গুলিবর্ষণ (Firing Strategy)

বিকেল 5:15-এ ডায়ার সেখানে পৌঁছান। কোনো সতর্কবাণী ছাড়াই তিনি গুলি চালানোর নির্দেশ দেন।

  • ডায়ার লক্ষ্য করেছিলেন যে মানুষ দেয়াল টপকে পালানোর চেষ্টা করছে। তিনি সৈন্যদের নির্দেশ দেন— “Fire where the crowd is thickest.” (যেখানে ভিড় সবচেয়ে বেশি, সেখানে গুলি করো)।
  • 1650 রাউন্ড .303 Mark VI গুলি খরচ হয়েছিল। এই হিসাবটি পরে সৈন্যদের খালি কার্তুজ গুনে বের করা হয়েছিল।
  • প্রতিটি গুলিতে গড়ে প্রায় 1 জন মানুষ হতাহত হয়েছিল, যা প্রমাণ করে যে গুলি কতটা লক্ষ্যস্থির করে চালানো হয়েছিল।

মার্শাল ল এবং ‘Reign of Terror’ (Post-Massacre Atrocities)

হত্যাকাণ্ডের পর পাঞ্জাবে যা ঘটেছিল তা ছিল আরও ভয়াবহ। 15 April থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে Martial Law জারি করা হয়।

ক্রলিং অর্ডার (The Crawling Order)

যে রাস্তায় মিস শেরউড আক্রান্ত হয়েছিলেন (Kucha Kaurianwala), ডায়ার নির্দেশ দেন যে সেই রাস্তা দিয়ে কোনো ভারতীয় হেঁটে যেতে পারবে না। তাদের পেটে ভর দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে (Crawling) যেতে হবে। কেউ দাঁড়ালে বা হাঁটু গেড়ে বসলে তাকে বেত্রাঘাত করা হতো।

সালামি অর্ডার (Salaam Order)

ভারতীয়দের নির্দেশ দেওয়া হয় যে কোনো ব্রিটিশ অফিসার দেখলেই তাদের গাড়ি বা ঘোড়া থেকে নেমে সালাম করতে হবে।

গুজরানওয়ালায় বিমান হামলা (Air Bombing)

ইতিহাসে এটি বিরল যে একটি সরকার তার নিজের নাগরিকদের ওপর বিমান হামলা চালাচ্ছে। 14 April, গুজরানওয়ালায় প্রতিবাদের সময় রয়্যাল এয়ার ফোর্স (RAF)-এর বিমান থেকে মেশিনগান চালানো হয় এবং বোমা ফেলা হয়। লেফটেন্যান্ট ডডকিন্স (Lt. Dodkins) তার রিপোর্টে লিখেছিলেন, তিনি মানুষকে “পিঁপড়ের মতো দৌড়াতে” দেখে মেশিনগান চালিয়েছিলেন।

ফ্যান্সি পানিশমেন্ট (Fancy Punishments)

কর্নেল ফ্র্যাঙ্ক জনসন (Frank Johnson) লাহোরে ছাত্রদের ওপর অদ্ভুত শাস্তি আরোপ করেন। ছাত্রদের রোদে দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য করা হতো এবং দিনে চারবার রোল কলের জন্য মাইলকে মাইল হাঁটতে হতো। কাসুর (Kasur) শহরে স্টেশনে একটি খাঁচা তৈরি করা হয়েছিল যেখানে সন্দেহভাজনদের রাখা হতো।


হান্টার কমিশন – জেরা ও স্বীকারোক্তি (The Investigation)

ব্রিটিশ সরকার চাপে পড়ে Disorders Inquiry Committee গঠন করে। লর্ড হান্টারের নেতৃত্বে এই কমিশনে তিন জন ভারতীয় আইনজ্ঞ ছিলেন— Sir Chimanlal Setalvad, Pandit Jagat Narayan, এবং Sardar Sultan Ahmed Khan। ভারতীয় সদস্যদের জেরার মুখেই ডায়ারের আসল রূপ বেরিয়ে আসে।

চিমনলাল সেতলবাদ ও ডায়ারের প্রশ্নোত্তর

এই অংশটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ এখানেই ডায়ার ফেঁসে যান।

  • সেতলবাদ: “আপনি কি আহতদের সাহায্য করার কোনো ব্যবস্থা করেছিলেন?”
  • ডায়ার: “না, সেটা আমার দায়িত্ব ছিল না। হাসপাতাল খোলা ছিল, তারা সেখানে যেতে পারত।” (যদিও তখন কার্ফু জারি ছিল)।
  • সেতলবাদ: “আপনি কি মনে করেন না যে গুলি চালানোটা একটু বেশি হয়ে গেছে?”
  • ডায়ার: “না। আমি যদি গুলি থামাতাম, তবে তারা আবার ফিরে আসত এবং আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করত (laugh at me)।”
  • ডায়ার আরও বলেন: “আমার উদ্দেশ্য জনতাকে ছত্রভঙ্গ করা ছিল না। আমার উদ্দেশ্য ছিল নৈতিক প্রভাব (Moral Effect) তৈরি করা, যাতে তারা আর কখনো ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে মাথা না তোলে।”

এই স্বীকারোক্তি প্রমাণ করে যে এটি নিছক আত্মরক্ষা ছিল না, এটি ছিল একটি পরিকল্পিত “Act of Terror”


কংগ্রেস ইনকোয়ারি কমিটি রিপোর্ট

হান্টার কমিশন যখন রিপোর্ট দিতে দেরি করছিল এবং ভারতীয়রা বুঝতে পারছিল যে ব্রিটিশরা ডায়ারকে বাঁচানোর চেষ্টা করছে, তখন মতিলাল নেহেরুর নেতৃত্বে কংগ্রেস নিজস্ব তদন্ত কমিটি গঠন করে।

  • এই রিপোর্টের খসড়া তৈরি করেছিলেন মহাত্মা গান্ধী নিজে। তিনি প্রতিটি গ্রাম ঘুরে 1,700-র বেশি সাক্ষীর জবানবন্দি নেন।
  • রিপোর্টের সারমর্ম: এই রিপোর্টে ডায়ার এবং ও’ডায়ার উভয়কেই দোষী সাব্যস্ত করা হয়। রিপোর্টে বলা হয়, পাঞ্জাবের প্রশাসন ইচ্ছাকৃতভাবে পরিস্থিতিকে উস্কে দিয়েছে যাতে তারা সামরিক শাসন জারি করতে পারে। কংগ্রেস মৃতের সংখ্যা 1,200-এর কাছাকাছি বলে দাবি করে।

ব্রিটিশ পার্লামেন্টে বিতর্ক এবং চার্চিলের ভূমিকা

July 1920-এ ব্রিটিশ হাউস অফ কমন্সে ডায়ারের বিচার নিয়ে বিতর্ক হয়।

উইনস্টন চার্চিলের বক্তব্য

তৎকালীন যুদ্ধসচিব (Secretary of State for War) Winston Churchill ডায়ারের কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি বলেন:

“The crowd was unarmed, except with bludgeons. It was not attacking anybody or anything… When you fire at a crowd to kill as many as possible, it is not the British way. It is sheer frightfulness (Schrecklichkeit).”

হাউস অফ লর্ডস

হাউস অফ কমন্সে ডায়ার নিন্দিত হলেও, অভিজাতদের সভা House of Lords ডায়ারের সমর্থনে প্রস্তাব পাস করে। তারা মনে করত ডায়ার ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে রক্ষা করেছেন। এই ঘটনা ভারতীয়দের কাছে পরিষ্কার করে দেয় যে ব্রিটিশ গণতন্ত্র ভারতীয়দের জন্য নয়।


উধাম সিং – দীর্ঘ প্রতীক্ষিত প্রতিশোধ (The Revenge)

জালিয়ানওয়ালাবাগের ঘটনা অনেক তরুণের মনে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছিল, তাদের মধ্যে একজন ছিলেন Sardar Udham Singh (জন্ম নাম: শের সিং)। তিনি অনাথ আশ্রমে বড় হয়েছিলেন।

  • শপথ: ঘটনার দিন তিনি জলসেবার কাজ করছিলেন (মতান্তরে)। তিনি রক্তমাখা মাটি হাতে নিয়ে শপথ করেছিলেন এর প্রতিশোধ নেবেন।
  • প্রস্তুতি: তিনি বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করেন, গদর পার্টির সাথে যুক্ত হন এবং অবশেষে 1930-এর দশকে লন্ডনে পৌঁছান।
  • হত্যা: 13 March 1940, লন্ডনের ক্যাক্সটন হলে (Caxton Hall) একটি মিটিং চলছিল। সেখানে মাইকেল ও’ডায়ার উপস্থিত ছিলেন। সভা শেষে উধাম সিং তার রিভলবার (যা তিনি একটি বইয়ের পাতা কেটে লুকিয়ে এনেছিলেন) বের করেন এবং ও’ডায়ারকে পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জে গুলি করেন। ও’ডায়ার ঘটনাস্থলেই মারা যান।
  • বিচার: আদালতে উধাম সিং নিজের নাম বলেন “Ram Mohammad Singh Azad” – যা ভারতের তিনটি প্রধান ধর্মের (হিন্দু, মুসলিম, শিখ) ঐক্যের প্রতীক। তাকে 31 July 1940-এ ফাঁসি দেওয়া হয়।

দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ও বিশ্লেষণ (Significance & Analysis)

গান্ধীজির রূপান্তর (Transformation of Gandhi)

এই ঘটনার আগে গান্ধীজি ছিলেন “রাজ”-এর সহযোগী (Co-operator)। তিনি যুদ্ধে ব্রিটিশদের সাহায্য করেছিলেন। কিন্তু জালিয়ানওয়ালাবাগ তাকে “অসহযোগী” (Non-cooperator)-তে পরিণত করে। তিনি বলেন, “Plassey laid the foundation of the British Empire, Amritsar has shaken it.”

বিপ্লবী আন্দোলনের জোয়ার

ভগত সিং তখন মাত্র 12 বছরের বালক ছিলেন। তিনি স্কুল পালিয়ে জালিয়ানওয়ালাবাগে গিয়েছিলেন এবং রক্তমাখা মাটি একটি কাঁচের বোতলে ভরে এনেছিলেন। এই মাটিই তাকে পরবর্তীকালে হিন্দুস্তান সোশ্যালিস্ট রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন (HSRA) গঠনে অনুপ্রাণিত করে।

কংগ্রেসের গণমুখী চরিত্র

এর আগে কংগ্রেস ছিল মূলত উচ্চবিত্ত ও বুদ্ধিজীবীদের সংগঠন। ১৯১৯-এর পর কংগ্রেসের অধিবেশনে কৃষকদের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। 1919 সালের অমৃতসর কংগ্রেস অধিবেশনে সভাপতি মতিলাল নেহেরু বলেছিলেন, “The undying spirit of Punjab has infused new life into the dead bones of India.”

খিলাফত ও অসহযোগ

জালিয়ানওয়ালাবাগের ক্ষোভ এবং খিলাফত ইস্যু (তুরস্কের সুলতানের অপমান) মিলে 1920-22 সালের অসহযোগ আন্দোলনকে একটি বিশাল আকার দেয়। হিন্দু-মুসলিম ঐক্য এই সময় সর্বচ্চ শিখরে পৌঁছায়।


বর্তমান প্রাসঙ্গিকতা এবং ক্ষমা প্রার্থনা বিতর্ক

আজও ভারত ও ব্রিটেনের কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে জালিয়ানওয়ালাবাগ একটি স্পর্শকাতর বিষয়।

  • রানি এলিজাবেথ (II): 1997 সালে ভারত সফরের সময় তিনি জালিয়ানওয়ালাবাগে যান এবং 30 সেকেন্ড নীরবতা পালন করেন। তিনি একে “Distressing example” বলেছিলেন কিন্তু ক্ষমা চাননি।
  • ডেভিড ক্যামেরন: 2013 সালে তিনি বাগে গিয়ে ভিজিটরস বুকে লেখেন, “This was a deeply shameful act in British history.”
  • ক্ষমা প্রার্থনার দাবি: শশী থারুরের মতো অনেক ভারতীয় বুদ্ধিজীবী এবং রাজনীতিবিদ দাবি করেছেন যে ব্রিটিশ সরকারের উচিত আনুষ্ঠানিকভাবে সংসদে ক্ষমা চাওয়া (Official Apology), যেমনটি তারা আয়ারল্যন্ডের ‘Bloody Sunday’-র জন্য বা কেনিয়ার মাউ মাউ বিদ্রোহের জন্য করেছিল।

গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব এবং তাদের উক্তি

ব্যক্তিত্বউক্তি/মন্তব্য
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর“Give me back my badge of honour…” (ভাইসরয়কে লেখা চিঠি)
মহাত্মা গান্ধী“It is impossible for me to be associated with a government that acts like this.”
বিপিন চন্দ্র পাল“A gigantic error of judgment.”
জেনারেল ডায়ার“I thought I would be doing a jolly lot of good.”

ঐতিহাসিক গ্রন্থপঞ্জি (Books for Reference)

  1. Amritsar: The Massacre that Ended the Raj – by Alfred Draper.
  2. The Butcher of Amritsar – by Nigel Collett.
  3. Jallianwala Bagh: An Empire of Fear and the Making of the Amritsar Massacre – by Kim A. Wagner.

জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড কেবল 1650 রাউন্ড গুলি বা 379 টি লাশের পরিসংখ্যান নয়। এটি ছিল ঔপনিবেশিক মানসিকতার চরম নগ্ন রূপ। হান্টার কমিশনের সামনে ডায়ারের দম্ভ এবং ব্রিটিশ পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষে তাকে সমর্থন— এই দুটি বিষয় ভারতীয়দের বুঝিয়ে দিয়েছিল যে ব্রিটিশ শাসনে তারা কখনোই ‘নাগরিক’-এর মর্যাদা পাবে না, তারা কেবলই ‘প্রজা’। এই বোধ থেকেই পূর্ণ স্বাধীনতার (Purna Swaraj) আকাঙ্ক্ষা তীব্র হয়। তাই বলা হয়, ভারতের স্বাধীনতার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল 1857-এ নয়, বরং 1919-এর সেই রক্তস্নাত বৈশাখী বিকেলে।

Leave a Comment